অশ্রুসিক্ত বিদায়ে শেষ হলো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়। ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেও অধরা থেকে গেল ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে লিওনেল মেসির সঙ্গে তুলনা নিয়ে করা প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন পর্তুগিজ মহাতারকা। তবে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে দুই কিংবদন্তির অর্জনের পার্থক্য আর আড়াল করার সুযোগ নেই। তবুও বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজের নামের পাশে কয়েকটি অনন্য রেকর্ড ঠিকই রেখে গেলেন রোনালদো।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্বকে শাসন করেছেন তিনি। অসংখ্য ম্যাচে একক নৈপুণ্যে বদলে দিয়েছেন ফলাফল, কঠিন মুহূর্তে দলকে টেনে তুলেছেন সামনে। রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও জুভেন্তাসে সাফল্যের সোনালি অধ্যায় রচনার পরও দীর্ঘ সময় বিশ্বের সেরাদের কাতারে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন রোনালদো। কিন্তু যে শিরোপাটি তার ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দিতে পারত, সেই বিশ্বকাপ ট্রফি শেষ পর্যন্ত অধরাই রয়ে গেল।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নেন ৪১ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড। এটিই ছিল তার ষষ্ঠ এবং শেষ বিশ্বকাপ। ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের করতালির মধ্যে বিদায় নেওয়ার সময় রোনালদো বলেছিলেন, নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। এমন এক ক্যারিয়ার, যা ফুটবলে দীর্ঘস্থায়িত্বের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
রোনালদোর বিদায়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পর্তুগালের সদ্য পদত্যাগী কোচ রবার্তো মার্টিনেজ। তিনি বলেন, এই বিশ্বকাপে তিনি যা করার চেষ্টা করেছেন, তার জন্য আমরা সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব। বিশ্বকাপ জেতাই ছিল তার স্বপ্ন। অধিনায়ক হিসেবে অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। এখন অন্য কিছু নিয়ে কথা বলার সময় নয়। তিনি ফুটবলের একজন আইকন, তার মতো মানুষ খুব বেশি নেই।
বিশ্বকাপে রোনালদোর উজ্জ্বল রেকর্ড
বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শেষ করলেন ২৭ ম্যাচে ১১ গোল করে। নকআউট পর্বে তার একমাত্র গোলটি আসে এবারের আসরে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে, যে গোল পর্তুগালকে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
২০০৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন রোনালদো। সেটিই ছিল বিশ্বকাপে তার সর্বোচ্চ সাফল্যের আসর। সে বছর পর্তুগাল সেমিফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের কাছে হেরে চতুর্থ স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন আসরে (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) গোল করার কীর্তি গড়েছেন রোনালদো। এছাড়া ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তার গোলটি বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি বয়সে (৪১ বছর ১৪৭ দিন) করা গোল হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। পুরো বিশ্বকাপ ইতিহাসে তার চেয়ে বেশি বয়সে গোল করেছেন শুধু ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলা, যার বয়স ছিল ৪২ বছর ৩৯ দিন।
২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স। বিশেষ করে ৮৮তম মিনিটে করা ফ্রি-কিক গোলটি আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
রোনালদোর বিদায়ী ম্যাচের পর স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, আমি তার বড় একজন ভক্ত। তার মূল্যবোধ, খেলাটিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং পেশাদারিত্ব আমাকে সবসময় মুগ্ধ করেছে। তরুণদের জন্য তিনি একজন আদর্শ।
বিশ্বকাপে দেখা হলো না মেসির সঙ্গে
ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে বহু বছর ধরে রোনালদো ও লিওনেল মেসির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায়। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনোই মুখোমুখি হওয়া হয়নি দুই মহাতারকার।
এবার সেই সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। পর্তুগাল যদি গ্রুপে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে পারত এবং দুই দলই পরবর্তী ধাপ অতিক্রম করত, তাহলে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে মুখোমুখি হতে পারতেন রোনালদো ও মেসি।
মেসি ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। পরে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে পূরণ করেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। অন্যদিকে রোনালদোর প্রতিটি বিশ্বকাপ যাত্রার সমাপ্তি হয়েছে হতাশায়। তার ১১ গোলের বিপরীতে মেসি চলতি বিশ্বকাপেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে গেছেন, যেখানে তার গোলসংখ্যা এখন ২০।
ফুটবল রোনালদোকে দিয়েছে অসংখ্য শিরোপা, রেকর্ড এবং ব্যক্তিগত সম্মাননা। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের আগেও তিনি বলেছিলেন, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই। তবুও দুটি স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল—বিশ্বকাপ ট্রফি জয় এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসির বিপক্ষে একটি স্মরণীয় দ্বৈরথ।


